শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী কৌশল
আজকাল শিশুদের দৈনন্দিন জীবন প্রযুক্তির সঙ্গে এতটাই মিশে গেছে যে কম বয়স থেকেই তারা মোবাইল, ট্যাবলেট এবং টেলিভিশন ব্যবহার করছে। তবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মানসিক ও শারীরিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে শুধু অভিভাবকের সঙ্গে ইন্টার্যাকটিভ ব্যবহার ছাড়া স্ক্রিন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অনেক অভিভাবক ব্যস্ত কাজ, গৃহস্থালি দায়িত্ব এবং বড় বা ছোট ভাইবোনের দেখাশোনার সঙ্গে নিজেদের স্ক্রিন ব্যবস্থাপনাও সামলাতে গিয়ে এই নির্দেশ পালন করা কঠিন মনে করতে পারেন। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও কিছু সহজ কৌশল প্রয়োগ করে শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
স্ক্রিন টাইম কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
স্ক্রিন টাইম বলতে বোঝায় যে শিশুরা কত সময় ধরে কম্পিউটার, মোবাইল, ট্যাবলেট বা টেলিভিশন ব্যবহার করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দুই বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু প্রতিদিন স্ক্রিন ব্যবহার করছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের সামাজিক, আবেগীয়, ভাষা ও মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিভাবকের উদাহরণ মূলক আচরণ
শিশুরা বড়দের আচরণ থেকে অনেক কিছু শেখে। তাই অভিভাবকদের উচিত নিজের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। ফোন বা ট্যাবলেট যতটা সম্ভব পাশে রাখা, খাবার ও ঘুমের সময়ে স্ক্রিন ব্যবহার না করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফ্ল্যাটফর্ম বন্ধ রাখা ইত্যাদি অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
খাবারের সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে স্ক্রিনের পরিবর্তে গান, গল্প, ছবি আঁকা বা “আই স্পাই” খেলা করা যায়। ঘুমের আগে এক ঘণ্টা স্ক্রিন বন্ধ রেখে গল্প বলা বা শান্ত আলোচনা করা শিশুর ঘুমের মান উন্নয়নে সহায়ক।
শিশুদের সঙ্গে কথোপকথন
শিশুদের সঙ্গে ছোট বয়স থেকেই আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বাস ভ্রমণ বা বাজার করা কিংবা ঘর পরিষ্কারের সময় শিশুর সঙ্গে কথোপকথন করতে পারেন। এই অভ্যাস শিশুদের ভাষাগত দক্ষতা এবং সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে।
প্রযুক্তিগত সাহায্য
অনেক স্মার্টফোনে স্ক্রিন টাইম সীমিত করার জন্য টুলস আছে। টাইমার, পিন কোড এবং নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার সীমাবদ্ধ করার সুবিধা ব্যবহার করে শিশুর স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এছাড়া অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের কার্যক্রম ট্র্যাক করা সম্ভব। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য সহায়ক প্রযুক্তিতে সময়সীমা প্রযোজ্য নয়।
স্ক্রিন টাইমের প্রভাব
বেশি স্ক্রিন টাইম শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক ও আবেগীয় উন্নয়ন, ঘুম এবং চোখের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুর প্রথম বছরগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় শিশুরা মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে।
‘চিলড্রেন অব দ্য টু-থাউজেন্ড টোয়েন্টিজ’ গবেষণায় দেখা গেছে যে- যারা দিনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করছে, তাদের শব্দভাণ্ডার কম থাকে, যেখানে কম সময় ব্যবহারকারী শিশুদের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি।
ভারসাম্যই মূল চাবিকাঠি
শিশুরা যদি অভিভাবকের সঙ্গে স্ক্রিন ব্যবহার করে, তা একাকী ব্যবহারের তুলনায় মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক। এটি সংযোগ, আলোচনা ও খেলার বিকল্প নয় বরং সহায়ক। অভিভাবকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সময় ও সীমা ঠিক করতে পারেন।
শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিভাবকরা যা করবেন-
- নিজের স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত করা
- খাওয়ার ও ঘুমের সময়ে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা
- শিশুর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা
- ব্যাকগ্রাউন্ডে স্ক্রিন না চালানো
- প্রযুক্তিগত টুল ব্যবহার করে সময় ও অ্যাপ নিয়ন্ত্রণ করা
শিশুর বিকাশ, নিরাপত্তা এবং ঘুমের মান বজায় রাখতে এই কৌশলগুলো সহজ, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত। সঠিক নির্দেশনা ও ব্যালান্স ধরে রাখলে প্রযুক্তি শিশুর শেখার প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে।
সূত্র : বিবিসি