চোখের উপযোগী ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ‘সনি ব্রাভিয়া এইট টু'

Staff Reporter

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৪৯

চোখের উপযোগী ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ‘সনি ব্রাভিয়া এইট টু'
ছবি : টিথ্রি

আজকের দিনে টেলিভিশন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং ঘরের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। সিনেমা, খেলা, গেমিং কিংবা মিউজিকসহ সব অভিজ্ঞতাকেই টিভি এখন ঘরের ভেতর সিনেমা হলের মতো করে তোলে। বর্তমান বাজারে প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রতিযোগী হাজির হচ্ছে। স্যামসাং, এলজি, প্যানাসনিক বা ফিলিপস প্রায় প্রতিবছর নতুন মডেল আনছে। অন্যদিকে সনি একটু আলাদা পথে হাঁটে। তারা প্রতি বছর নতুন টিভি আনে না। বরং কয়েক বছর পর একেবারে নতুন রূপে হাজির হয়।

২০২৫ সালে সেই ধারাবাহিকতায় এসেছে Sony Bravia Eight II। এটি সনির নতুন ফ্ল্যাগশিপ ওএলইডি টিভি। আগের ব্রাভিয়া এইট টু (২০২৪) বা এ নাইনটি ফাইভ এল (২০২৩) এখনো বাজারে পাওয়া যায়। ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত হতে পারেন কোন মডেলটি কেনা উচিত। তবে এইট টু একেবারেই নতুন প্রযুক্তি ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে।

দাম ও সাইজ
এইট টু বাজারে এসেছে দুটি সাইজে।
পঞ্চান্ন ইঞ্চি: দাম দুই হাজার একশ নিরানব্বই পাউন্ড। মার্কিন দামে প্রায় দুই হাজার নয়শ নিরানব্বই ডলার। অস্ট্রেলীয় বাজারে চার হাজার একশ নিরানব্বই ডলার।
পঁয়ষট্টি ইঞ্চি: দাম দুই হাজার ছয়শ নিরানব্বই পাউন্ড। মার্কিন দামে প্রায় তিন হাজার চারশ নিরানব্বই ডলার। অস্ট্রেলীয় বাজারে পাঁচ হাজার দুইশ পঁচানব্বই ডলার।

দাম শুনে প্রথমে অনেকের মনে হতে পারে এটি কেবল ধনীদের জন্য। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাজারে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই ছাড় দেওয়া শুরু হয়েছে। আর সেই ছাড়ে এর দাম নেমে এসেছে প্রতিদ্বন্দ্বী Samsung S Ninety Five F–এর সমান। এটি স্পষ্ট করে যে প্রিমিয়াম টিভির বাজারে প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তির নতুন সংযোজন
ব্রাভিয়া এইট টু'র মূল আকর্ষণ হলো নতুন প্রজন্মের কিউডি-ওএলইডি প্যানেল। কোয়ান্টাম ডট প্রযুক্তি এখানে ছবির উজ্জ্বলতা ও রঙকে করেছে আরও উন্নত।

  • আগের মডেলের তুলনায় প্রায় পঁচিশ শতাংশ বেশি উজ্জ্বলতা পাওয়া যায়
  • সর্বোচ্চ প্রায় দুই হাজার নিটস ব্রাইটনেস
  • ছবিকে আরও প্রাকৃতিক করতে আছে AI scene recognition
  • ডলবি ভার্সন সমর্থন থাকলেও HDR10 Plus নেই
  • Filmmaker Mode না থাকলেও সিনেমার জন্য Professional Mode রাখা হয়েছে

সনি সবসময় বলে থাকে- তাদের টিভি দর্শকদের জন্য হলো স্টুডিও থেকে লিভিং রুমে। অর্থাৎ পরিচালক যেভাবে ছবিটি বানিয়েছেন, দর্শক যেন ঘরে বসেই তেমনভাবে দেখতে পান।

ডিজাইন
সনির ডিজাইনে সবসময় বাড়তি মনোযোগ দেখা যায়। ব্রাভিয়া এইট টু-এর পেছন দিকও বেশ পরিপাটি। তার ও সংযোগ লুকানোর জন্য আলাদা ঢাকনা রয়েছে। এতে চারটি HDMI পোর্ট আছে, তবে এর মধ্যে মাত্র দুটি পুরোপুরি HDMI 2.1 সমর্থন করে। এই দুটি পোর্টে একশ বিশ হার্টজ সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু গেমারদের জন্য এটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। বিশেষ করে যারা একসাথে Xbox Series X, PlayStation 5 এবং সাউন্ডবার ব্যবহার করতে চান, তাদের কিছুটা সমঝোতা করতে হবে।

স্ট্যান্ড নিয়ে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। স্ট্যান্ডটি টিভির একেবারে প্রান্তে বসানো। ফলে আসবাবপত্র টিভির সমান চওড়া হতে হয়। পঞ্চান্ন ইঞ্চি মডেলে স্ট্যান্ডের প্রস্থ বারো শত চব্বিশ মিলিমিটার আর পঁয়ষট্টি ইঞ্চি মডেলে চৌদ্দ শত তেতাল্লিশ মিলিমিটার। যাদের টেবিল ছোট তাদের জন্য এটি ঝামেলা তৈরি করবে। তবে সুবিধাও আছে। স্ট্যান্ড নিচু অবস্থায় বসালে টিভি টেবিলের সাথে প্রায় লেগে থাকবে। আবার উঁচু করলে নিচে সাউন্ডবার বসানোর জায়গা হয়ে যাবে। ফলে সাউন্ডবার ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বেশ কার্যকর সমাধান।

ছবির মান
ওএলইডি প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিখুঁত কালো রঙ দেখানো। কিউডি-ওএলইডি সেই কালোকে আরও গভীর করেছে, সঙ্গে বাড়িয়েছে উজ্জ্বলতা। ফলে সিনেমা বা সিরিজ দেখা যেন সত্যিই সিনেমা হলে বসে দেখা। Netflix, Prime Video এবং সনির নিজস্ব Bravia Core-এর জন্য আলাদা ক্যালিব্রেটেড মোড রয়েছে। ডলবি ভিশন কনটেন্টের পারফরম্যান্স একেবারেই অসাধারণ। যেমন Netflix এর Wednesday সিরিজের অন্ধকার দৃশ্যগুলোও নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে।

তবে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। HDR10 Plus সমর্থন না থাকায় Prime Video–এর অনেক কনটেন্টে পূর্ণ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় না। আবার Professional Mode অনেকের চোখে তুলনামূলক অন্ধকার মনে হতে পারে। সনি ব্রাভিয়া এইট টুতে অ্যান্টি গ্লেয়ার ফিনিশ আছে, কিন্তু স্যামসাংয়ের মতো প্রতিফলন প্রতিরোধে এতটা কার্যকর নয়। ফলে উজ্জ্বল ঘরে বসে অন্ধকার সিনেমা দেখা কিছুটা কঠিন হতে পারে।

সাউন্ড কোয়ালিটি
এই টিভিতে সনির নিজস্ব Acoustic Surface Audio Plus প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। স্ক্রিনের পেছনে বিশেষ অ্যাকচুয়েটর বসানো হয়েছে যা পুরো স্ক্রিনকেই স্পিকারের মতো কাজ করায়।

  • চারটি চ্যানেল
  • পঞ্চাশ ওয়াট আউটপুট
  • Dolby Atmos এবং DTS X সমর্থন

ফলে শব্দ আসে সরাসরি স্ক্রিন থেকেই। এটি সাধারণ টিভির তুলনায় অনেক ভালো অভিজ্ঞতা দেয়। তবে বড় বাজনা বা ভারী অ্যাকশন মুভিতে শক্তিশালী সাউন্ড চাইলে আলাদা সাউন্ডবার লাগানোই উত্তম।

স্মার্ট ফিচার
সনি ব্রাভিয়া এইট টু চলে Google TV প্ল্যাটফর্মে।

  • Google Assistant দিয়ে ভয়েস কন্ট্রোল
  • Apple AirPlay ও Google Cast সুবিধা
  • Netflix ও Prime Video-তে ক্যালিব্রেটেড মোড
  • Bravia Core-এ আল্ট্রা এইচডি সিনেমা

Google TV সহজ ও ব্যবহারবান্ধব হলেও এর হোমস্ক্রিন কিছুটা সাধারণ। তবে সনির নিজস্ব ছবি ও সাউন্ড কন্ট্রোল মেনুগুলো অনেক উন্নত। ফলে ব্যবহারকারীরা চাইলে খুঁটিনাটি নিয়ন্ত্রণ নিজের মতো করে নিতে পারবেন।

প্রতিযোগিতার বাজারে
সনি ব্রাভিয়া এইট টু'র সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো Samsung S Ninety Five F। একই QD-OLED প্যানেল ব্যবহার করেছে। উজ্জ্বলতা বেশি, প্রতিফলন নিয়ন্ত্রণও উন্নত। উজ্জ্বল আলোয় ভরা ঘরের জন্য এটি ভালো বিকল্প। অন্যদিকে LG OLED G Five এসেছে পাতলা নকশায় যা দেয়ালেই ঝুলিয়ে রাখার জন্য উপযুক্ত। সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতায়ও এটি অসাধারণ।

সনি ব্রাভিয়া এইট টু নিঃসন্দেহে ২০২৫ সালের অন্যতম সেরা ওএলইডি টিভি। নিখুঁত ছবি, গভীর কালো, ডলবি ভিশন সমর্থন এবং পরিপাটি ডিজাইন একে বিশেষ করে তোলে।

তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন মাত্র দুটি এইচডিএমআই ২.১ পোর্ট, এইচডিআর ১০ প্লাস সমর্থনের অভাব এবং প্রশস্ত স্ট্যান্ড। এগুলো অনেকের জন্য অসুবিধা হতে পারে। তবুও যারা সিনেমার আসল স্বাদ পেতে চান, তাদের জন্য ব্রাভিয়া এইট টু একটি নির্ভরযোগ্য পছন্দ হতে পারে।

সূত্র : টিথ্রি