ভাষার লড়াইয়ে জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা শীর্ষক সেমিনার
বিপন্ন বিস্ময়ের কবি জীবনানন্দের ভাষা নিয়ে সিদীপের আলোচনা
রাজধানীর আদাবর শেখেরটেকে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন এন্ড প্র্যাকটিসেস (সিদীপ)-এর অডিটোরিয়ামে ‘শিক্ষালোক ও এবং বইয়ের’ আয়োজনে জীবনানন্দ দাসের ভাষাচিন্তা নিয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ‘ভাষার লড়াইয়ে জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি আমীন আল রশীদ।
তিনি বলেন, জীবনানন্দ দাস বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। তাঁর এই চিন্তাকে তিনি “ভাষাচিন্তা ও দুশ্চিন্তা” বলে উল্লেখ করেন, কারণ বাংলা ভাষার প্রতি গভীর প্রেম থেকেই এই উদ্বেগ জন্ম নিয়েছিল।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় জীবনানন্দ কলকাতায় থাকলেও মানসিকভাবে পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
জীবনানন্দ মনে করতেন, কোনো ভাষা শুধু মানুষের সংখ্যার কারণে টিকে থাকে না; সেই ভাষায় মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি না হলে ভাষার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁর সময়ে সাহিত্যে বড় ধরনের নতুন সূচনার লক্ষ্মণ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
আলোচনায় কবি ও গবেষক সৈকত হাবিব বলেন, জীবনানন্দ দাসকে আমরা সাধারণত ‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে চিনি, কিন্তু তাঁর ভেতরে এক গভীর সমাজসচেতন ও ভাষাপ্রেমিক সত্তা ছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।
ড. কাজল রশীদ শাহীন বলেন, দেশভাগের পর বাংলা ভাষা একদিকে হিন্দি এবং অন্যদিকে উর্দুর চাপের মুখে পড়ে। জীবনানন্দ তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে ভাষা বাঙালির প্রধান পরিচয়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, অনেক মানুষ বাংলা শেখার আগ্রহ হারাচ্ছে এবং বাঙালিদের মধ্যেও ভাষাচর্চায় শৈথিল্য দেখা দিচ্ছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক খান মো. রবিউল আলম বলেন, "কবিতা হচ্ছে শিল্পের পরম রূপ আর জীবনানন্দ তাঁর ভাষায় এই সাঙ্গীতিক পরম রূপ তৈরি করেছেন। তাঁর ভাষাটাই তো আলোড়িত করে সবাইকে কেননা তার ব্যাকরণ ও বিন্যাসই নতুন।"
‘এবং বই’ এর সম্পাদক ফয়সাল আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ড. অখিল পোদ্দার, ইসহাক খান, কবি কামরুল হাসান, শিল্পী শিশির মল্লিক, লেখক আবদুল হালিম খানসহ অন্যান্য বক্তারা। তাঁরা বলেন, জীবনানন্দের ভাষাচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাহিত্যিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা। কারণ লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হলে মেধাবী লেখকেরা সাহিত্যচর্চা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন।
জীবনানন্দের মতে, ছোট দেশও উন্নত সাহিত্য সৃষ্টি করলে বিশ্বসভায় নিজের ভাষাকে মর্যাদা দিতে পারে। তাই বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ রক্ষায় সাহিত্যচর্চা ও ভাষা সচেতনতার গুরুত্ব অপরিসীম।